একনজরে ভারতের ভাষা ও তার ক্রমবিকাশ…

একটা বিষয় কি আমরা কখনও ভেবে দেখেছি যে, নানা ভাষায় ঋদ্ধ ভারতের সব ভাষার মধ্যে কিছু কিছু শব্দ প্রায় সব ভাষাতেই আমরা শুনতে পাই। ভাবতে অবাক লাগে, উত্তর থেকে দক্ষিণ হোক বা পূর্ব থেকে পশ্চিম … জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস সবকিছু আলাদা হওয়া সত্বেও কি করে কিছু শব্দের অদৃশ্য সুতোয় গোটা ভারতীয় ভাষার বিন্যাস গাঁথা রয়েছে। সে রহস্যের উৎস খুঁজতে গেলে একবার ঈগলের চোখ দিয়ে দেখে নিতে হবে ভারতীয় ভাষার ইতিহাস।

Written by: Chandrasekhar G

Translated by: Pamela B

“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগ্বম শাশ্বতীস্বমাঃ

যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধী কামমোহিতম।।”

শরবিদ্ধ ক্রৌঞ্চের যন্ত্রণায় বিরহাতুর ক্রৌঞ্চীর কান্না শুনে কাতর হয়ে বাল্মিকী উচ্চারণ করেছিলেন এই দুই পংক্তি। বলা হয়ে থাকে, এই দুই পংক্তিই আসলে পৃথিবীর প্রথম কাব্য বা সাহিত্য বা ইতিহাস। তাই হয়ত নিজের অজ্ঞাতেই প্রথম কাব্য সৃষ্টির পর আদি কবির পরবর্তী স্বগতোক্তি ছিল “কিমিদম বিবৃতম ময়া”(এ আমি কি বললাম?)। আসলে কাব্য সৃষ্টি হয়েছে লিপি প্রবর্তনের বহু আগে। গুহাচিত্রের ভাষা থেকে বেরিয়ে এসে আজকের টেকস্যাভি মিশ্র ভাষা… এই বিবর্তনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বদলে যাওয়ার ইতিহাস। আমাদের রোজকার কথ্য ভাষায় মিশে যাচ্ছে এমন এক ভাষা, যার জন্ম এদেশ থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে। আর ভারতীয় ভাষার জননী হিসেবে স্বীকৃত সংস্কৃত ক্ষয়প্রাপ্ত এক কাঠামো নিয়ে ক্রমশ বিলীন হয়ে চলেছে ভাষা থেকে ভাষান্তরে।

পৃথিবীতে জীবিত প্রতিটি প্রাণীর প্রাথমিক চাহিদার মধ্যে আছে খাদ্য, বাসস্থান, বংশবিস্তার এবং আত্মরক্ষা। শুধুমাত্র মানবজাতিই পারে মস্তিষ্ক বা বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে এইসব প্রাথমিক চাহিদার বাইরে গিয়ে অন্যভাবে ভাবতে। মানুষের আকৃতির তুলনায় হাতি অনেকটাই বড়ো কিন্তু হাতির মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক আজ থেকে প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে সব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল। ইতিহাস যাকে বলে বিবর্তন। বইয়ের ভাষায় বলতে গেলে “জ্ঞানগত বিপ্লব”। নববিকশিত মস্তিষ্ক চালনায় মানবজাতি নির্দিষ্ট ভৌগলিক স্থানে বসতি স্থাপন করে, জানতে শুরু করে নিজের পারিপার্শ্বিক এবং তারপরেই প্রয়োজন পরে ভাব আদানপ্রদানের। শারিরীক সীমাবদ্ধতার দরুণ কথা বলা তখনও সম্ভবপর ছিল না। তাই সাহায্য নিতে হয় সংকেতের। সেখান থেকেই শুরু ভাষার ক্রমবিকাশের প্রথম পর্যায়, সাংকেতিক ভাষা। হাত পা নেড়ে, কখনও বা ছবি এঁকে নিজের লব্ধ জ্ঞান আশেপাশের মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত করা। পরবর্তীকালে মৌখিক ভাষার পাশাপাশি আসে লিপি। কিন্তু সে অনেক পরের ঘটনা। ভাষাবিদরা আজও নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না কোন ভাষা সর্বপ্রথম পূর্ণরূপ পেয়েছিল পৃথিবীতে। এর অন্যতম কারণ, “জ্ঞানগত বিপ্লব”-এর একেবারে প্রথম দিকে মানুষ অনেক ভাষাই গড়ে তুলেছিল কিন্তু সময়ের প্রভাবে তার অধিকাংশই অঙ্কুরেই শেষ হয়ে গেছে। তাই নির্দিষ্টভাবে কোন ভাষাকে সর্বপ্রথম ভাষার শিরোপা দেওয়া সত্যিই কঠিন। তাই আমাদের আলোচনা বর্তমানে প্রচলিত ভাষা এবং তাদের প্রাচীনত্ব নিয়েই।

 

ভারতীয় ভাষা

পৃথিবীতে এখন প্রায় ৭৭০ কোটি মানুষ জীবিত। ৫০০০-এর বেশি ভাষায় তাঁরা কথা বলে থাকেন। আমাদের দেশের জনসংখ্যা ১৩০ কোটি এবং ২০১০ থেকে ২০১৩-এর মধ্যে সম্পাদিত ভারতের জন ভাষাতাত্বিক সমীক্ষা (PLSI) অনুসারে ভাষার সংখ্যা ৭৮০-রও বেশি। ১৬৫০ থেকে ১৯৬১-এর মধ্যে বহুভাষা বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গেছে। এইভাবে চলতে থাকলে আর প্রায় ১০০ বছর পরে ভারতীয় ভাষার সংখ্যা ৫০০-এর নীচে নেমে আসবে। ভারতীয় সংবিধানের ৮ম তফশিলে ২২টি ভাষা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই ভাষাগুলি হল: ১. অসমিয়া, ২. বাংলা, ৩. বোড়ো, ৪. ডোগরি, ৫. গুজরাটি, ৬. হিন্দি, ৭. কন্নড়, ৮. কাশ্মিরী, ৯. কোঙ্কনি, ১০. মৈথিলী, ১১. মালয়ালম, ১২. মনিপুরী, ১৩. মরাঠি, ১৪. নেপালি, ১৫. ওড়িয়া, ১৬. পঞ্জাবী, ১৭. সংস্কৃত, ১৮. সাওতালি, ১৯. সিন্ধী, ২০. তামিল, ২১. তেলুগু এবং ২২. ঊর্দূ।

মূলগত দিক থেকে দেখতে গেলে ভারতীয় ভাষাকে চারটি শ্রেণিতে রাখা হয়, ১. ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠী, ২. দ্রাবিড় ভাষাগোষ্টী, ৩. অ্যাস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠী, ৪. তিব্বতি-বার্মা ভাষাগোষ্ঠী। এই চারটি বিভাগের মধ্যেই অধিকাংশ ভারতীয় ভাষার বিষয়ে জানা যায়।

১. ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠী

প্রথমেই আসা যাক ইন্দো-ভারতীয় ভাষাগোষ্ঠীর কথায়। বিশ্বের মধ্যে এটিকেই বৃহত্তম ভাষাগোষ্ঠী হিসেবে ধরা হয়। এই গোষ্ঠীর মধ্যে প্রথমেই আছে সংস্কৃত। এই ভাষার প্রথম সাহিত্যিক নিদর্শন ঋক বেদ। অনেকে বলে থাকেন, ঋক বেদই হল পৃথিবীর সর্বপ্রথম সাহিত্যিক নিদর্শন। যদিও অনেকেই এই মতের বিরোধিতা করেছেন। সে প্রসঙ্গ থাক। মূলত বৈদিক যুগেই এই ভাষার সর্বাধিক প্রচলন ছিল। পূজার্চনা এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় আচার পালনে এই ভাষাই ছিল একমাত্র আধার। খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১০০০-এর মধ্যবর্তী সময়কালকে ধরে এগোনো যেতে পারে। পরবর্তীকালে, বৈদিক সংস্কৃত ক্রমশ এক অন্যতর রূপ নেয়, যাকে কাব্যিক সংস্কৃত আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। মোটামুটি ১০০০ থেকে ৬০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত কাব্যিক সংস্কৃতের সময়কাল ধরা যেতে পারে। সংস্কৃতের এই রূপ ক্রমশ ৬০০ খ্রীষ্টপূর্ব থেকে ১০০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে পালি, প্রাকৃত এবং অপভ্রংশের জন্ম দেয়।

পালি: সময়কাল ৫৬৩ থেকে ৪৮৩ খ্রীষ্টপূর্ব। এই ভাষাতেই নিজের ধর্মপ্রচার করেছিলেন গৌতম বুদ্ধ।

প্রাকৃত: সময়কাল ৬০০ খ্রীষ্টপূর্ব থেকে ১০০০ খ্রীষ্টাব্দ। কাব্যিক সংস্কৃতের বর্ণমালা থেকে কিছু বর্ণ লুপ্ত বা পরিবর্তনের ফলে এই ভাষার জন্ম হয়। বহু বৌদ্ধ, জৈন কাব্য ও লিপিতে এই ভাষার প্রয়োগ দেখা যায়।

অপভ্রংশ: প্রাকৃত থেকে এই ভাষার জন্ম। যেহেতু প্রাকৃতের অনেকগুলি রূপান্তর সাহিত্যে দেখা যেত, তাই এই ভাষাকে অপভ্রংশ বলা হয়ে থাকে। অপভ্রংশ থেকে বর্তমানে প্রচলিত অনেক ভাষার জন্ম হয়েছে। তার মধ্যে আছে, ১. হিন্দি, ২. ঊর্দূ, ৩. বাংলা, ৪. পঞ্জাবী, ৫. অসমিয়া, ৬. গুজরাটি, ৭. ওড়িয়া, ৮. মারাঠি, ৯. কাশ্মিরী, ১০. কোঙ্কনি, ১১. নেপালি, ১২ সিন্ধি এবং আরও অনেক।

১. হিন্দি: বর্তমানে ভারতের প্রায় ৬৫ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, হরিয়াণা, হিমাচল প্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং ছত্তিশগড়ের অধিবাসীদের কথ্য ভাষা এই হিন্দি। কথ্য হিন্দিকে আবার বেশ কয়েকটি শ্রেণিতে ফেলা যেতে পারে, রাজস্থানি, ব্রজ, বুন্দেরি, মালবি, ভোজপুরী এবং মেওয়াড়ি। ভারতের অধিকাংশ মানুষের কথ্য ভাষা হওয়ার দরুণ হিন্দিকে অনেকেই রাষ্ট্রভাষা বলে থাকেন। যদিও সংবিধান স্বীকৃত ২২টি ভাষাই ভারতের জাতীয় ভাষা কিন্তু হিন্দিভাষীর তুলনায় তাদের সংখ্যা কম হওয়ার দরুণ হিন্দি এই সম্মানে ভূষিত।

২. ঊর্দূ: সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১১ কোটি মানুষের ভাষা ঊর্দূ। আলাউদ্দীন খিলজির দাক্ষিণাত্য জয়ের পরে এই ভাষা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। হায়দরাবাদসহ অনেক জায়গায় ঊর্দূকে দক্ষিণী ভাষাও বলা হয়ে থাকে।

৩. বাংলা: পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষা প্রায় ১০০০ বছরের পুরোনো।

৪. পঞ্জাবী:  প্রায় ১০ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষাও প্রায় ১০০০ বছরের পুরোনো।

৫. অসমিয়া: প্রায় ২.৫ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষা প্রায় ১২০০ বছরের পুরোনো।

৬. গুজরাটি: প্রায় ৬.৫ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষা প্রায় ১১০০ বছরের পুরোনো।

৭. ওড়িয়া: প্রায় ৪ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষা প্রায় ১২০০ বছরের পুরোনো।

৮. মারাঠি: প্রায় ৮ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষা প্রায় ১১০০ বছরের পুরোনো।

৯. কাশ্মিরী: প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষা প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো।

১০. কোঙ্কনি: মূলত গোয়া এবং কিয়দংশে ম্যাঙ্গালোর, মুম্বই এবং কেরলের মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষাভাষী মানুষেরা মূলত খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ভুক্ত।

১১. নেপালি: প্রায় ১.৭ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন।

১২. সিন্ধী: দেশজুড়ে প্রায় ২ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন।

দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠী

ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর পরে দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর স্থান। এই ভাষাগোষ্ঠীতে ২৩টি ভাষাকে চিহ্নিত করা গেছে। তাদের মধ্যে প্রধান তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম।

১. তামিল: পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ভাষা হল তামিল। ভারত, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ার অধিবাসী প্রায় ৮ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। খ্রীষ্টপূর্ব সময়েও এই ভাষার সাহিত্যিক নিদর্শন পাওয়া যায়।

২. তেলুগু: অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানার প্রায় ৮.৫ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষা প্রায় ২০০০ বছরের পুরোনো।

৩. কন্নড়: প্রায় ৪.৫ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই ভাষা প্রায় তেলুগুর সমসাময়িক।

৪. মালয়ালম: কেরলবাসী প্রায় ৪ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। প্রায় ১০০০ বছরের পুরনো এই ভাষার জন্ম তামিল থেকে।

ফলে তামিল ও মালয়ালম এবং তেলুগু ও কন্নড় লিপির মধ্যে বেশ কিছু সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

অ্যাস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা

সাঁওতালি, মুন্ডারি, হু, সাভারা, কোর্ক, জোয়াং, খাসি এবং নিকোবরির মতো ভাষা এই ভাষাগোষ্ঠীর অন্তভূর্ক্ত।

তিব্বতি-বার্মা ভাষা

এই ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে প্রধান প্রধান ভাষাগুলি হল বোড়ো, মনিপুরী, লুস্থা, গাড়ো, ভুটিয়া, নেওয়ারি, লেপচা, আসমকা এবং মিকির।

ভাষার উৎস এবং ইতিহাস খতিয়ে দেখতে গেলে দেখা যাবে ভারতের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগোষ্ঠী ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অধিকাংশ ভাষারই জন্ম সংস্কৃত থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমানে মাত্র ১৫,০০০ মানুষই এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। তাই সর্বভাষার জননী আমাদের আদিতম ভাষা সংস্কৃত আজ মূলত ধর্মীয় আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে থেকে গেছে।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published.